
জাতীয় ডেস্ক ঃ সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৮ দিনে ৪৯ লাখ ৯ হাজার ৪৯ জন যাত্রী মেট্রোরেলে ভ্রমণ করেছে। এতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের আয় হয়েছে ২০ কোটি ৬৭ লাখ ৩ হাজার ৫৯১ টাকা।
বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএসটিসিএল) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত কনফারেন্সে এই তথ্য জানান ডিএমটিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ।
তিনি বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯ লাখ ৯ হাজার ৪৯ জন যাত্রী মেট্রোরেলে ভ্রমণ করেছে।
এতে আমাদের আয় হয়েছে ২০ কোটি ৬৭ লাখ ৩ হাজার ৫৯১ টাকা। এর মধ্যে ২ শুক্রবার বন্ধ ছিল।
অন্য দিকে মেট্রো রেল উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যে আয় সেটি সংসদে তুলে ধরেছিলেন ততকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ।তিনির এই বক্তব্য ঐ সময় যুগান্তর পত্রিকা প্রকাশ করে যাতে জনাব কাদের বলেন, অডিট ফার্মের নিরীক্ষা করা ২০২২-২৩ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী জুন মাস পর্যন্ত মোট আয় ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৬ হাজার ৫১৪ টাকা।
তিনি বলেন, ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর হতে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ এবং গত বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশ প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন। এখন শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৭টা ১০ মিনিট থেকে রাত ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত উত্তরা উত্তর হতে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মিত চলাচল করছে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুসরণে এমআরটি লাইন-৬ মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটার বর্ধিত করার জন্য নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এ পর্যন্ত কাজের সার্বিক অগ্রগতি ২৫ ভাগ। আগামী বছর জুন মাসে এই অংশ চালু করার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে

ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় গত ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় মেট্রো লাইনের নিচের পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে জননিরাপত্তার স্বার্থে ওই দিন বিকেল সাড়ে ৫টার পর মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার পরেরদিনও একাধিক মেট্রোরেল স্টেশনে হামলা হয়। অবশেষে, ৩৭ দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৫ আগস্ট থেকে যাত্রী সেবা দেওয়া শুরু করেছে মেট্রোরেল। আজ (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কম্পানি লিমিটেড (ডিএসটিসিএল) সূত্রে গণমাধ্যমে মেট্রোরেলের আয় সম্পর্কে একটি সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রচার হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৮ দিনে ৪৯ লাখ ৯ হাজার ৪৯ জন যাত্রী মেট্রো রেলে ভ্রমণ করেছেন। এতে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের আয় হয়েছে ২০ কোটি ৬৭ লাখ তিন হাজার ৫৯১ টাকা। এদিকে গত ০৫ আগস্ট তারিখে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরই প্রেক্ষিতে আজ (২২ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দাবি প্রচার করা হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের আগে মেট্রোরেলে গত ৬ মাসে আয় ছিলো ১৮ কোটি টাকা। সরকার পরিবর্তনের পর বর্তমানে ১৮ দিনেই আয় ২০ কোটি।
পরিবর্তনের আগে অথবা গত ৬ মাসে ১৮ কোটি এবং গনঅভ্যুত্থান অথবা পরিবর্তনের পর ১৮ দিনে ২০ কোটি মর্মে দাবিতে :

ফ্যাক্টচেকঃ
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, মেট্রোরেল থেকে ছয় মাসে ১৮ কোটি টাকা আয়ের হিসেব ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে মেট্রোরেল উদ্বোধনের পর ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাস সময়ের। গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পূর্বের বিগত ছয় মাসের নয়। তাছাড়া, প্রথমদিকে মেট্রোরেল সীমিত স্টেশন হয়ে স্বল্প দূরত্বে সীমিত সময় চলাচল করতো এবং রুটও ছিল ছোট, কিন্তু বর্তমানে তার চেয়ে বেশি দূরত্বে অধিক স্টেশন হয়ে দীর্ঘসময় চলাচল করে, তাই প্রথম ছয় মাসের সাথেও তুলনা অযৌক্তিক।
বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে। এদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেট্রোরেল উদ্বোধন করেন এবং পরদিন জনসাধারণের চলাচলের জন্য মেট্রোরেল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রথমে যাত্রাপথে কোনো স্টপেজ ছাড়াই উত্তরা-আগারগাঁও রুটে উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও স্টেশনে সকাল ৮ থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত দৈনিক ৪ ঘণ্টা মেট্রোরেল চলাচল করে। পরে পর্যায়ক্রমে আরও ৫টি স্টেশন চালু হয়। ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি তারিখে দিয়াবাড়ি ও আগারগাঁওয়ের পর তৃতীয় মেট্রোরেল স্টেশন হিসেবে পল্লবী স্টেশন চালু হয়। এদিন থেকে মেট্রোরেল চলাচলের সময়সূচি কিছুটা পরিবর্তন করে সকাল সাড়ে ৮ টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২ টা করা হয়। তবে সময়সীমা আগের মতো ৪ ঘণ্টাই বলবৎ থাকে।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ স্টেশন হিসেবে উত্তরা সেন্টার স্টেশন চালু হয়। একই বছরের ০১ মার্চ মেট্রোরেলের পঞ্চম স্টেশন হিসেবে এবার চালু হলো মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশন।
পরবর্তীতে ১৫ মার্চ তারিখে ষষ্ঠ ও সপ্তম কাজীপাড়া ও মিরপুর-১১ স্টেশন চালু হয়।
২০২৩ সালের ৩০ মার্চ তারিখে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ৫ এপ্রিল থেকে মেট্রোরেল চলাচলের সময়সীমা দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত করা হয়েছে।
তার পরের দিন ৩১ মার্চ তারিখে মেট্রোরেলের শেওড়াপাড়া ও উত্তরা দক্ষিণ স্টেশন জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। যার মাধ্যমে উত্তরা-আগারগাঁও রুটের সবকটি (৯টি) স্টেশন চালু হয়। পরবর্তীতে, গত বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন।
অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধন হলেও মেট্রোরেল আংশিকভাবে সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করে। অতঃপর ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে স্টেশন সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মেট্রোরেল চলার সময়ও বাড়ানো হয়। তাছাড়া, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের সূত্রমতে, বর্তমানে মেট্রোরেল সকাল ৭ টা ১০ মিনিট থেকে রাত ০৯ টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত সেবা প্রদান করে৷ অপরদিকে শুরুর ছয় মাসের মধ্যে এই সংখ্যা সীমিত পরিসরে ছিল তা ধাপে ধাপে আজকের সময়ে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথম ছয় মাসের তুলনায় বর্তমান সময়ে মেট্রোরেল বেশি এলাকাজুড়ে এবং বেশি সময় ধরে সেবা প্রদান করছে। তাই, স্বাভাবিকভাবেই এই দুই সময়ের আয়ের তুলনা করা অযৌক্তিক।
গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বে বিগত সরকারের আমলে মেট্রোরেল গত ৬ মাসে ১৮ কোটি টাকা আয় করেছে এমন দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম যুগান্তরে “৬ মাসে মেট্রোরেলের আয় ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা” শিরোনামে গত ০৪ মার্চ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৬ হাজার ৫১৪ টাকা আয় হয়েছে। […] সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৬ হাজার ৫১৪ টাকা আয় হয়েছে। ওবায়দুল কাদের বলেন, অডিট ফার্মের নিরীক্ষা করা ২০২২-২৩ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী জুন মাস পর্যন্ত মোট আয় ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৬ হাজার ৫১৪ টাকা।
সেসময় তিনি বলেন, ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর হতে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ এবং গত বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশ প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন।”
এছাড়া, মূলধারার সংবাদমাধ্যম চ্যানেল২৪ এ “৬ মাসে মেট্রোরেলের আয় ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে থেকেও একই বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
২০২৪ সালের প্রথম ৬ মাসে মেট্রোরেল থেকে কত টাকা আয় হয়েছে তা জানতে রিউমর স্ক্যানার টিম যোগাযোগ করে ঢাকা মাস ট্র্যানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রউফের সাথে। তিনি জানান, গত ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত মেট্রোরেল থেকে ১৯৫ কোটি ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩৮ টাকা আয় হয়েছে। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে মেট্রোরেল ৬ মাসে ১৮ কোটি টাকা আয় করার তথ্যটি গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বের বিগত গত ৬ মাসের নয়, বরং মেট্রোরেল উদ্বোধনের পর প্রথম ছয় মাস সময়ের। উল্লেখ্য, উল্লিখিত প্রথম ছয় মাস সময়ে সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় তুলনামূলক সীমিত পরিসরে মেট্রোরেল চলাচল করতো।
তাছাড়া, মেট্রোরেলের প্রথম ছয় মাসের চেয়ে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৮ দিনের আয় বেশি হওয়া প্রসঙ্গে আব্দুর রউফ জানান, “মেট্রোরেলের প্রথম ছয় মাসে এখনকার মতো মেট্রোরেল চলেনি। তখন চলেছে সীমিত পরিসরে। সীমিত জায়গায় চলতো। তাছাড়া এখনকার সময়ের চেয়েও কম সময় চলতো তখন৷ আস্তে আস্তে মেট্রোরেলকে সম্প্রসারিত করা হয়েছে এবং এখন আগের চেয়ে বড় পরিসরে চলে তাই আয়টাও বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্বোধনের পরের প্রথম ছয় মাসের তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।”
মেট্রোরেল উদ্বোধনের প্রথম ছয়মাসের চেয়ে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৮ দিনে আয় বেশি হওয়া প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মেট্রোরেল পরিচালনাকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড-ডিএমটিসিএলের এমডির দায়িত্ব পাওয়া আবদুর রউফ অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “বিষয়টা সহজ। প্রথম ছয় মাস তো ট্রেন চলেছে ৪ ঘণ্টা, ২০ মিনিট পরপর, তাও উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে। তাহলে আয় কম হবে না?”
“এখন তো ফুল সুইংয়ে চলছে। এখন সব স্টেশন এক সঙ্গে চলছে। ট্রিপ বেড়েছে। যাত্রী বেশি হবে। এখন আয় বেশি হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। অঙ্ক না বুঝলে কেমনে চলবে? এটা নিয়ে অযথাই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।”

Leave a comment