
জাতীয় ডেস্ক ঃ প্রিয় দেশবাসী, ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস । ১৯৭১ সালের এইদিনে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র মানুষের উপর সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। পরবর্তী নয়মাস দেশীয় সহযোগীদের নিয়ে তারা ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করে, চার লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করে, এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী বাধ্য হন, দেশের ভেতর পালিয়ে বেড়ানো ৪ কোটি মানুষ, বহু মানুষকে তারা জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণে বাধ্য করে, অসংখ্য বাড়িঘর, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাসহ সব অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়। বাঙালি জাতি পরিচয় মুছে ফেলার অভিপ্রায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা সংগঠিত এই নৃশংসতা, ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। জেনোসাইড বা গণহত্যা। এই গণহত্যার স্মৃতিকে ধরে রাখতে, গণহত্যার শিকার আমাদের জাতির মানুষদেরকে শ্রদ্ধা জানাতে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ মহান জাতীয় সংসদে আমরা ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।
সম্মানিত দেশবাসী আপনাদের মনে আছে, পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমাদের ভাষা আন্দোলনের সূচনা। সেদিন তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এর প্রেক্ষিতেই ১৯৫২ সালের মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানীরা আমাদেরকে আভ্যন্তরীন উপনিবেশে পরিণত করেছিল, তারা আমাদের ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুছে ফেলতে চেয়েছিল। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয়দফা আন্দোলন, আগরতলা মামলা বিরোধী আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন এবং ’৭১-এর মার্চের শুরু থেকে অসহযোগ আন্দোলন সংগঠিত হয়। এইসব ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যদিয়ে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে যার মূলে রয়েছে উদার অসাম্প্রদায়িকতা। বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন এই জাতি-পরিচয়ের প্রধান পুরুষ। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী আতংকিত হয়, আমাদের বাঙালি পরিচয় মুছে ফেলতে না পারলে সাম্রাজ্যবাদী পাকিস্তানের ধ্বংস অনিবার্য। তাই চুড়ান্ত পরিকল্পনা হিসেবে তারা ২৫ মার্চ রাতে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে।
এই গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, হত্যা বন্ধের যুদ্ধে জয়ী হয়েই আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্জন করি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির জন্য সচেষ্ট ছিলেন, তেমনি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দেশীয় গণহত্যাকারীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরে অবৈধ শাসকেরা সেই বিচার বন্ধ করে দিয়ে দেশীয় গণহত্যাকারীদের ক্ষমতার অংশীদার করে নেয়। আপনারা জানেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-বিডি) গঠন করে এই ঘাতকদের বিচার কার্যক্রম আবার শুরু করে। যে প্রক্রিয়ায় শীর্ষ ঘাতকদের অনেকের সর্ব্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে এবং বাকীদের বিচার চলমান থাকে। এই বিচার নিশ্চিত করা, অজস্র শহীদ পরিবারের কাছে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার। বিচারের পাশাপাশি ’৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্যও আমরা কাজ করি। বাংলাদেশ সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের অ্যাকটিভিস্টদের যৌথ প্রচেষ্টায় চারটি গুরুত্বপুর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি আদায়ে আমরা সক্ষম হই।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অবৈধ শক্তি ৫ আগস্ট ক্ষমতা দখল করে নিলে পুরো চিত্র পাল্টে যায়। আপনারা নিজেরা এসবের সাক্ষী এবং ভিক্টিম। আইসিটি-বিডিতে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয়, বন্দী যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের আইনজীবিকে প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা বানিয়ে শহীদ পরিবারগুলোর সাথে নিষ্ঠুর উপহাস করে। ১৯৭১ সালের মতোই তারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে হত্যা শুরু করে, পরিকল্পিত ভাবে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়, শতাধিক মাজার ও মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থাপনায় আগুন দেয়, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের সূতিকাগার বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িসহ অগণিত ঐতিহাসিক নিদর্শন গুঁড়িয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও মুক্তির লড়াইয়ের সকল স্মারকচিহ্ন গুঁড়িয়ে দেয়, গ্রন্থাগার ও জাদুঘরগুলো ধ্বংস করে, বুদ্ধিজীবি ও সাংস্কৃতিকর্মীদের আক্রমন করে। ’৭১-এর মতো এবারও তাদের লক্ষ্য উদার ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয় পরিচয়কে নিশ্চিহ্ন করা। সেই অর্থে- ৫ আগস্ট থেকে তারা আবারও একটি জেনোসাইড/ গণহত্যা শুরু করেছে যা ’৭১-এর গণহত্যারই ধারাবাহিকতা। ’৭১-এর গণহত্যার মূল অপরাধী-রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে নানারকম প্রকাশ্য ও গোপন সম্পর্ক এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করে। জেনোসাইড বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘লেমকিন ইন্সটিটিউট অফ জেনোসাইড প্রিভেনশন’ গত সেপ্টেম্বরে মাসেই সতর্কতা জারি করে বলেছে, ৫ আগস্টের পর থেকে চলমান সহিংসতায় বাংলাদেশে গণহত্যার চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই গণহত্যা প্রতিরোধের জন্য লেমকিন ইন্সটিটিউট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে, এ-বছর ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা স্মরণ দিবস’ আমাদের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আমি জানি, আপনাদের সকলের জীবন এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় পর্যুদস্ত। কিন্তু আমরা সেই বীরের জাতি যারা ’৭১-এর গণহত্যা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেইনি। নিরস্ত্র অবস্থায়ও আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম, মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাকারীদের পরাজিত করেই আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম। আমরা আমাদের জাতি পরিচয় সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেই আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও বিজয়ের স্মৃতি আমাদেরকে পথ দেখাবে ও নতুন পথের সন্ধান দিবে।
আসুন, আজকের এইদিনে গণহত্যায় শহীদ আমাদের অগণিত স্বজনদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ যে মানুষেরা আমাদের জাতি-পরিচয় নির্মাণে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাঁদেরকে স্মরণ করে তাঁদের জীবন ও কর্ম থেকে দীক্ষা গ্রহণ করি। তাঁদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম থেকে আমরা সাহস অর্জন করি। বাংলাদেশ গণহত্যাকারীদের দেশ নয়, বাংলাদেশ ন্যায়ের পথে লড়াই করা অজস্র বীরের দেশ। পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বাংলাদেশের সকল মানুষ আজ গভীর দুঃসময়ে নিপতিতি। কিন্তু ষড়যন্ত্রই শেষ কথা নয়, দুঃসময়ই শেষ পরিণতি হতে পারে না। অচিরেই আমরা আলোয় উদ্ভাসিত হবো এবং আবারও বাংলাদেশের মানুষের জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসবে।
সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ’ ৭১-এর গণহত্যাকারীদের মতো বর্তমান গণহত্যাকারীদেরকেও আমরা পরাজিত করবো, ইনশাল্লাহ।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
তারিখ: ২৪ মার্চ ২০২৫
ছবি ও বিবৃতি ঃ সৌজন্য, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ফেইসবুক পেইজ

Leave a comment