
————————————————————————-
ভূমিকা : বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন , যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হলে শিক্ষার সকল স্তরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে । আর সেটি করতে হলে স্কুল কলেজ গভর্নিং বডি দিয়ে না চালিয়ে শিক্ষা অধিদফতরের লোকদেরকে দিয়েই চালাতে হবে । তবে সেখানে গভরনিং বডি কিংবা ম্যানেজিং কমিটি যে নামেই থাকুক না কেন তারা মনিটরিং কমিটি হিসেবে থাকবেন , কোন সভাপতি থাকার প্রয়োজন নেই । কারন বিশ্বের কোন উন্নত দেশে গভরনিং বডি কিংবা ম্যনেজিং কমিটি যে নামেই থাকুক সেই কমিটিতে কোন সভাপতির পদ থাকে না । ঐ সকল দেশে অভিভাবকদের কে নিয়ে মাসিক কিংবা ঐমাসিক পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয় যেখানে অভিভাবকরা তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন শিক্ষার মান উন্নয়নে । শিক্ষকরা তাদের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপ্রনীত শিক্ষানীতি ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রনিত বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন ।

আসুন বিষয়টি বিশদ ব্যাখ্যা করার আগে বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা অথাৎ শিক্ষার হার নিয়ে একটু আলোচনা করি । আমেরিকার শিক্ষার হার শতকরা ৯০% ( হাই স্কুল পাস ), উচ্চশিক্ষার হার ৩৮% , ইংল্যান্ডে যথাক্রমে এই হার ৯৮% ও ৫১% , কানাডা ৯৪% ও ৫৭% , ফ্রীনলেন্ডে ৯৯% ও ৩০% , সুইজারল্যান্ডে ৯০% ও ৫২% ভারতে ৮০% ও ২৯% শ্রীলংকাতে ৯২% ও ১% , বাংলাদেশে ৭৮% ও ৮.৫০% । এখানে শ্রীলংকার লোকেরা একে বারেই উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করে না । তাদের শিক্ষা হাই স্কুল পর্যন্ত প্রায় সীমাবদ্ধ অপর দিকে বাংলাদেশের এই হার শুধু মাত্র স্বাক্ষরজ্ঞান কিংবা প্রাথমিক পর্যন্ত , হাই স্কুল নয় । তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার হার কিছুটা দক্ষিন এসিয়ার ভারত বাদে অন্যদেশের চেয়ে কিছুটা ভালো । শিক্ষার হার সব দেশেই মাধ্যমিক স্তর পাস ধরে হিসেব করা হয়েছে । এখন কথা হলো উন্নত দেশ গুলিতে শিক্ষার হার বেশি থাকার পর ও সে সব দেশে কোন গভরনিং বডির সভাপতি পদ নেই এবং কোন এমপি ও ঐ পদে থাকেন না কিন্তু তাদের শিক্ষার হার অনেক বেশী । কারন কি ? তাদের যুগোপযোগী শিক্ষা নীতি ,
সামগ্রীক শিক্ষা গ্রহনের সুবিধা , স্কুল থেকে জড়েপড়া রোধ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান ও রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত পরিবেশ ।
অপর দিকে আমাদের দেশে স্কুল ও কলেজে গভর্নিং বডি থাকে যারা ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম দেখ ভাল করেন । কিন্তু সমষ্যা হলো এই সব গভর্নিং বডির সভাপতি যিনি নির্বাচিত হন তার কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার নুন্যতম সীমারেখার ক্ষেত্রে কোন আইন নেই । যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের পছন্দমত কিংবা দলীয় লোকেরা মনোনিত হন । এতে করে প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসএস সি পাস কিংবা তার ও কম কোন কোন ক্ষেত্রে স্বাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন লোকেরা ও সভাপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন এ রকম শত শত উদাহরণ রয়েছে । মাঝে মধ্যে সরকার নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক ও হাই স্কুলে ব্যাচেলর বলে প্রজ্ঞাপন জারি করার কথা শুনা গেলে ও তা কখনো আলোর মুখ দেখে বলে মনে হয় না । কার্যত কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। তারচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো হাই স্কুলে বিএ পাস আর অপর দিকে কলেজের বেলায় শিক্ষাগত যোগ্যতার নুন্যতম সীমা রাখা হয় উচ্চ মাধ্যমিক , যা রীতিমত হাস্যকর ।তার একটি মাত্র কারন হলো কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে স্থানীয় এমপিরা থাকতে চান এবং বাংলাদেশের এম পি দের শতকরা ৫০% ভাগের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ পাসের নীচে । সুতরাং যদি নুন্যতম সীমা বিএ পাস রাখা হয় তাহলেতো তারা সভাপতি হতে পারবেন না । কিন্তু বিশ্বের কোন দেশেই এমপিরা স্কুল কিংবা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি থাকেন না কারন এমপির কাজ হলো আইন প্রনয়ন করা তাকে কেন স্কুলের সভাপতি পদে থাকতে হবে ? বাংলাদেশের কারনটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং এর মূল উদ্দেশ্য কি সেটা দেশের আপামর জনগণ জানেন সেটি না হয় আজ এখানে আলোচনা করলাম না ।
তাহলে আসুন আরেকটু বিস্তারিতভাবে ব্যখ্যা করি । একটি কলেজ কিংবা হাই স্কুলে যদি মেট্রিক পাশ সভাপতি হয় , উনি কেরিকুলাম কি জিনিস , কিংবা মান সম্পন্ন পাঠ দান হচ্ছে কি না সেটা কোনভাবে নিজেই বুঝতে পারবে না কারন কলেজে একাদশ , দ্বাদশ , কিংবা বিএ ক্লাসে কি পড়ানো হয় সেটিতো তিনি জানেই না কারন তিনিতো কোন দিন কলেজে পড়েন নি । যে লোক নিজেই জানেন না কলেজে কি পড়ানো হয় তিনি কিভাবে সেটি তদারকি করবেন । তিনিতো শুধু হেডমাস্টার কিংবা প্রিন্সিপাল কে শুধু জিজ্ঞেস করবেন স্যার কি সব ঠিক আছে ? জনাব বলবেন হ্যা জনাব সব ঠিক আছে । এই ভাবেই উন্নয়ন সাধিত হবে ? আসলে কোন দলই এই বিষয়টি জানার পর ও শুধু রাজনৈতিক কারনে শিক্ষাগত যোগ্যতার নুন্যতম সীমা গ্রেজুয়েশন সেটি বাস্তববায়ন করে না , যা খুবই দুঃখজনক ।
পৃথিবীর সকল দেশে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত কিংবা কম শিক্ষিত, ধনী গরিব সবাই এমপি হয়ে থাকে এতে সমস্যা নেই । কিন্তু শিক্ষা প্রতিস্টান ভিন্ন জিনিস , এটি মানুষ গড়ার কারিগরী প্রতিষ্ঠান । পৃথিবীর কোন দেশ নেই যেখানে গভর্নিং বডিতে রাজনৈতিক ব্যাক্তি কিংবা এমপি সভাপতি থাকেন । বিদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদারকিতে প্রসাশনিক ব্যাক্তিবর্গ থাকে, যাদের সবাই শিক্ষিত লোক । কিন্তু শুধু মাত্র আমাদের দেশে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও এমপিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভাপতি থাকেন যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় । আর যদি রাখতেই হয় তাহলে রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের মধ্যে অবশ্যই উচ্চ শিক্ষিতদেরকে রাখতে হবে, যারা নুন্যতম গ্রেডুয়েট । কারন কি , কারন হলো গভনিং বডির কাজ হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুস্টুভাবে পাঠদান , মান সম্পন্ন শিক্ষা ও কারিকুলাম অনুযায়ী পড়ালেখা হচ্ছে কি না সেটি তদারকী করা ।
গত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ও এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছি । বর্তমান সরকারের একজন শিক্ষামন্ত্রী উনি বিদেশে পড়ালেখা করে ও কেন এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন সেটি আমার ভূদোগম্য নয় । তবে এটা পরিষ্কার বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কপালে প্রচুর দুংখ দুর্দশা আছে এবং সেটি হয়তো থাকবে দীর্ঘ দিন ।যতদিন না পর্যন্ত পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো না হবে , রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা না হবে এবং সর্বোপরি নুন্যতম ব্যাচেলর ডিগ্রি প্রাপ্ত লোকদেরকে গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া না হবে ততদিন পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন , যুগোপযোগী কিংবা আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় ।
লেখক ,
আব্দুল ওহাব জোয়ারদার
লেখক , গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
পিএইচডি ফ্যলো
ইআইএমটি
সুইজারল্যান্ড

Leave a comment