
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ঘুমন্ত মানুষের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর গন হত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক অন্ধকারতম রজনী হিসেবে চিহ্নিত, যেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করেছিল। এই নৃশংস সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমবর্ধিষ্ণু বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা—যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রজ্জ্বলিত করেছিল।
বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পূর্ব বাংলার জনগনের মধ্যে পরাধীনতার শৃঙ্খল বেদ ও স্বাধীনতাকামী মানুষের মাঝে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল; কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ও তৎপরবর্তী ২৩শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে যখন প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সামরিক সরকার শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এর জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২৫শে মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেসামরিক নাগরিক, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের লক্ষ্য করে—বিশেষত ঢাকায়—একটি সমন্বিত আক্রমণ চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এলাকাগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, যেখানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ও অধ্যাপককে হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ট্যাঙ্ক ও মেশিনগানসহ ভারী মারণাস্ত্র ব্যবহার করে। প্রতিরোধ আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পুরো এলাকা বা মহল্লা ধ্বংস করে ফেলা হয়।
সহিংসতার মাত্রা ছিল ব্যাপক ও নির্বিচার। কেবল প্রথম রাতেই হাজার হাজার মানুষ নিহত হন এবং পরবর্তী দিন ও মাসগুলোতেও এই দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকে। বহু নারী ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই সময়ে সংঘটিত নৃশংসতাগুলোকে বহু ইতিহাসবিদ ও মানবাধিকার সংস্থা ব্যাপকভাবে গণহত্যা হিসেবেই গণ্য করে থাকেন।
২৫শে মার্চের ঘটনাবলি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে উদ্দীপ্ত করে তোলে। নৃশংস দমন-অভিযান শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ২৫শে মার্চ পাক বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পূর্ব মূহুর্তে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, পরবর্তীতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজে এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।যার ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের সূচনা হয়। তৎকালিন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল যার নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সমর্থন আদায় করা এবং মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কতৃক পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের স্বশস্ত্র সংগ্রাম ও অসীম ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ২৫শে মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়—যা এ দেশের মানুষের সহ্য করা অপরিসীম দুর্ভোগ এবং তাদের অদম্য সহনশীলতার এক গভীর স্মারক। এই ঘটনাবলিকে স্মরণ করা কেবল ভুক্তভোগীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই অপরিহার্য নয়, বরং এমন নৃশংসতা যেন আর কখনো পুনরাবৃত্তি না হয়—তা নিশ্চিত করার এবং নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন।
—- আবুল ওহাব জোয়ারদার মছুফ
লেখক , রাজনীতিবিদ , গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক ব্যাংকার ও প্রভাষক (রাজনীতিবিজ্ঞান ) এম,এস,এস ও পেইচডি ফ্যালো ।

Leave a comment