
১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে, এক কঠিন ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সময়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনরুজ্জীবন, আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারাবাহিকতাকে মূর্ত করে তুলেছিল। সেই সময় থেকে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়নে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন।
দেশে প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করে তোলা। ১৯৭৫-পরবর্তী বছরগুলোতে দলটি নানামুখী কঠোর চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার সম্মুখীন হয়েছিল। শেখ হাসিনা দলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগকে পুনরায় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সমর্থকদের মনে নতুন দিকনির্দেশনা ও আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করেছিল।
তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার আরেকটি প্রধান তাৎপর্য ছিল বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর অসামান্য অবদান। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে রাজনীতিতে সামরিক প্রভাব এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর বিধিনিষেধ পরিলক্ষিত হয়। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে শেখ হাসিনা অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। অবাধ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দাবিতে তিনি প্রতিবাদ কর্মসূচি, রাজনৈতিক জোট এবং গণআন্দোলন সংগঠিত করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অসামান্য অবদান রাখে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা বহুবিধ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রবর্তন করেন, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতকে আমূল বদলে দেয়। তাঁর নেতৃত্বে দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে যা ছিলো ৭.৫% এর ও বেশি ।পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব সাধিত হয়। পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল , এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দৃস্টি নন্দন পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা -চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানজট নিরোসনে ঢাকায় অসংখ্য ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বৃহৎ পরিসরের প্রকল্পগুলো আধুনিকায়ন ও জাতীয় উন্নয়নের প্রতি তাঁর সরকারের বিশেষ গুরুত্বারোপকেই প্রতিফলিত করে এবং বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল এবং উন্নয়নশীল বাংলাদেশ বিনির্মানের অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যায় ।
নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার প্রসারেও শেখ হাসিনা এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সরকার রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সুযোগের পরিধি প্রসারিত করে। নারী শিক্ষার সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও লিঙ্গ সমতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখেন। তাঁর নেতৃত্বকালে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
এছাড়া ও একজন মানবিক নেতা হিসেবে তিনি বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেন ।বিশেষ করে মিয়ানমারে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নানাবিধ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সত্ত্বেও মানবিক দায়বদ্ধতা প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন ছিল একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা; কারণ এটি দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিল এবং দেশের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়েছিল। নিজের নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। যদিও রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা গণতান্ত্রিক সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবুও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক অভিযাত্রায় তাঁর প্রভাব যে অনস্বীকার্য, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। আর এ কারণেই, ১৯৮১ সালে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে আজও সমুজ্জ্বল।
লেখক ,
ড.আব্দুল ওহাব জোয়ারদার
লেখক , গবেষক, রাজনীতিবিদ , সাবেক প্রভাষক ও ব্যাংকার

Leave a comment