https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-5623148770593961

শিক্ষামন্ত্রীর নকল প্রতিরোধে জেহাদ ঘোষনা আর স্হানীয় সরকার মন্ত্রীর জিপিএ তুলে নেওয়ার পরামর্শ দেশের শিক্ষার মান উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে কতটুকু কার্যকর ?
———————————————————
জনাব ড. এহছানুল হক মিলন বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন । জনাব এহসানুল হক মিলন বিএনপি সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার শেষ সরকারের সময় ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন । সময়টি ছিলো ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল । তিনি যখন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নকল প্রবনতার হার উদ্বেগজনক ছিলো এবং তিনি দায়িত্ব নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল প্রতিরোধকল্পে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে তিনি সফল ও হন । তার সময়ে শিক্ষা প্রতিস্টানে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নকল করার প্রবণতা অনেকটা কমে আসে । যদি ও ঐ সময় তিনি শিক্ষা ব‍্যবস্হায় প্রশ্ন ব‍্যাংকের নামে নতুন সিস্টেম প্রবর্তন করেন যার ফলে শিক্ষার্থীরা ঐ নির্দিষ্ট ৫০০টি প্রশ্ন মুখস্ত করে প্রতিটি বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রায় ৮০% পরীক্ষার্থী প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে যায় যা প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন‍্য বিরাট অন্তরায় ছিলো এবং ঐ সকল শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এতে করে দেশে প্রশ্ন ব‍্যাংক সিস্টেমটি ব‍্যাপকভাবে সমালোচিত হয়।

পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ঐ প্রশ্ন ব‍্যাংক সিস্টেমটি বাতিল করে দেন এবং কারিগরি ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ‍্যে ড. কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ‍্যে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন । এতে করে দেশের প্রচলিত শিক্ষা ক‍্যরিকুলাম বাদ দিয়ে নতুন ক‍্যরিকুলাম প্রনয়ন করে শ্রেনীকক্ষে পাঠ দান শুরু হয় যা পুরোপুরি না হলেও মোটামুটি ৬০% শিক্ষা প্রদ্ধতি বিদেশি শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত ছিল বলা যায় । যদি ও ঐ সময় পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয় নি বরং গনহারে অধিক নম্বর প্রদানে শিক্ষকদেরকে পরামর্শ প্রদান করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উৎসাহিত করা হয় । এতে করে জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের বন‍্যা বয়ে যায় , যার নেতীবাচক প্রভাব পড়ে শিক্ষার সঠিক মান উন্নয়নে । অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক ও ব‍্যাচেলর ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদেরকে ইংরেজিতে একটি আবেদন পত্র কিংবা সহজ সহজ ইংরেজি শব্দের বাংলা অর্থ বলতে না পারার ব‍্যর্থতা ফুটে উঠে । আর এতে করে নতুন এই আধুনিক শিক্ষা প্রদ্ধতি ও কার্যত ব‍্যর্থতায় পর্যবসিত ও সমালোচনার সম্মুখীন হয় ।

বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী এবার নতুন দায়িত্ব নিয়ে আবার নকল প্রতিরোধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন। উনি প্রতিদিন কোন না কোন সভায় ঐ একটি বিষয় নকল প্রবনতা নিয়েই বক্তব্য দিচ্ছেন যানদেখে মনে হচ্ছে তিনি যেন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও মান উন্নয়নে এক মাত্র নকলকেই দায়ী করছেন ।কিন্তু আসলে কি একমাত্র নকলই দায়ী নাকি সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি , ক্লাসে মান সম্মত পাঠ দান , বিশ্ব মানের ক‍্যরিকুলামের অভাব , শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষামূখী করে গড়ে তোলার ব‍্যর্থতা , শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা এবং সর্বোপরি শারীরিক ও মানসিকভাবে শিক্ষার্থীদের কে সুশিক্ষায় গড়ে তুলার কার্যকরী ব‍্যবস্হার অনুপস্হিতিই দায়ী ।

জনাব শিক্ষামন্ত্রীকে বুঝতে হবে উনি এখন আর ২০ বছর আগের শিক্ষামন্ত্রী নন । এখন নকলই মান সম্মত শিক্ষার একমাত্র অন্তরায় নয় , কারন বর্তমান ক‍্যরিকুলামে নকল করার খুব একটা সুযোগ কিংবা প্রয়োজন দুটিই নেই । এখনকার শিক্ষা পাঠ্যক্রম রচনা ও মূখস্ত ভিত্তিক নয় , এসাইনমেন্ট‍ ও সৃজনশীল ভিত্তিক যা একজন শিক্ষার্থীকে তার নিজের মেধা ব‍্যবহার করে সমাধান বের করতে হয় । এবং এটিই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বহুল প্রচলিত। সুতরাং শিক্ষামন্ত্রীকে ১৭/১৮ বছর আগের ধ‍্যান ধারনা থেকে বের হয়ে কিভাবে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা মান সম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারে এবং দেশ এবং বিদেশে সেই শিক্ষা ব্যবস্থা সম মানে গৃহীত হয় সেই অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন‍্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহকে নির্দেশ প্রদান করতে হবে। এ বিষয়ে পরামর্শ আকারে বলা যায় প্রথম থেকে দশম পর্যন্ত শুধু এসাইনমেন্ট ভিত্তিক পরীক্ষা হবে । শিক্ষকরা ক্লাসে যা পড়াবেন তার উপরেই সাপ্তাহিক অ্যাসাইনমেন্ট পরীক্ষা হবে এবং তাতে যে মূল্যায়ন করা হবে সেটি কম্পিউটারে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা হবে এবং বছর শেষে সে অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশ করা হবে। বছর শেষে ৬০০/৮০০/কিংবা ১০০০ মার্কের কোন চুড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহনের প্রয়োজন হবে না ।শুধু অস্টম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিদেশের নিয়মে ASAT ও SAT পরীক্ষা হবে এবং SAT ও ক্লাসের সকল পরীক্ষার চুড়ান্ত মূল্যায়ন দিয়েই শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবে।এই প্রদ্ধতি আমেরিকা ও ইউরোপের সকল দেশে অনুসরন করা হয়ে থাকে ।

প্রসংঙ্গক্রমে এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই , গতকাল‍্য স্হানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সিলেটের একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রীকে জিপিএ তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন যা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি । জিপিএ সিস্টেম বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের মান সম্মত নির্নায়ক হিসেবে স্বীকৃত । আপনাকে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে কোন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু মাত্র ঐ দেশের জন্য প্রস্তুত করা হয় না কারন একজন শিক্ষার্থী সে শুধু মাত্র তার শিক্ষাকে ঐ দেশে কাজে লাগায় না । দেশ ও পরিবারের স্বার্থে তাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে হয়। তখন ঐ সব শিক্ষার্থীদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে হয়। জিপিএ সিস্টেম না থাকলে বাংলাদেশের কোন স্কুল , কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা ইউরোপ কিংবা আমেরিকার কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগই পাবে না। এমনিতেই বাংলাদেশ থেকে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থীদেরকে ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মান সম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় । দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত মান সম্পন্ন না হওয়ার কারনে এখন পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষায় সমমান পাওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে যদি জিপিএ বাদ দেওয়া হয় তাহলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পিছনের দিকে ধাবিত হবে সামনের দিকে নয় এটি নির্ধিদায় বলা যায় ।

সুতরাং পরিশেষে বলতে চাই নকল প্রতিরোধের পাশাপাশি মান সম্পন্ন ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বজায় রাখা যায়, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধি, দূর্নীতি দমন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কার্যকর গবেষনা , সার্টিফিকেট বিক্রি বন্ধ করনে কার্যকরী উদ্যোগ জরুরী । একই সাথে উন্নত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ক‍্যরিকুলাম প্রনয়ন ও আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি চালুকরণ সহ সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করি ।

—- আব্দুল ওহাব জোয়ারদার
লেখক , সাবেক প্রভাষক, ব‍্যাংকার ,রাজনৈতিক বিশ্লেষক , গবেষক ও পিএইচডি ফেলো , ইআইএমটি, সুইজারল্যান্ড ।

Leave a comment

Trending